4 February- 2023 ।। ২১শে মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

রবিউল আউয়ালের পয়গাম

– ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ্ নেই।

মাহে রবিউল আউয়ালের মুবারক দিনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পবিত্র দরবারে অগণিত শোকরিয়া আদায় করছে এবং প্রিয় নবী মোহাম্মাদ মোস্তাফা আহমদ মুজতবা (সা.)-এর খেদমতে পেশ করছি অগণিত দরূদ ও সালাম, যার পরে আর কোনো নবী নেই। আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত আমাদের এই অন্তর-খেঁচা নিবেদন কবুল ও মঞ্জুর করুন, আমীন!

পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত সারা দুনিয়ার মানুষকে সুপথের পথিক করার জন্য এবং তাদেরকে স্বীয় মুকাররাব বান্দাহরূপে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে যুগে যুগে, কালে কালে বহু নবী ও রাসুলগণকে দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ পাকের প্রেরিত পুন্যাশ্রায়ী এই বান্দাহগণ তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে প্রমাণ করেছেন। পরিশেষে এই ধুলার ধরণীতে শুভাগমন করলেন দো’জাহানের সর্দার আকায়ে নামদার তাজদারে মাদীনা, রাহমাতুল্লিল আলামীন, সাইয়্যেদুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যিন হজরত মোহাম্মদ মুস্তাফা আহমাদ মুজতবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১২ রবিউল আউয়াল দুনিয়াতে শুভাগমন করেন। নবীর মুবারক দায়িত্ব বা রিসালাতের মহামিশনের সফলতা সম্পন্ন করেন তিনি। ইসলামি সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার সূচনা যে হিজরত, তা-ও সংঘটিত হয়েছিল এ মাসেই। আবার এই মাসেরই ১২ তারিখে আখেরি নবীর তিরোধান বা ওফাত হয়েছিল।

কালক্রমে দিনটি মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সীরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। যার এর অর্থ হলো প্রিয় নবী (সা.)–এর জন্মানুষ্ঠান এবং তাঁর পথে চলার সঙ্কল্প গ্রহণ। ধীরে ধীরে এর সঙ্গে ‘ঈদ’ শব্দ যোগ হয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রূপ লাভ করে। যার অর্থ হলো মহানবী (সা.)–এর জন্মোৎসব। এ পর্যায়ে আরেকটি পরিভাষাও প্রচলিত হতে থাকে ‘সিরাতুন নবী (সা.) অর্থাৎ নবী (সা.)–এর জীবন চরিত বা জীবনী আলোচনা অনুষ্ঠান।

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মতারিখ নিয়ে সিরাত গ্রন্থ, জীবনীকার, ইতিহাসবেত্তা ও জ্যোতির্বিদদের মধ্যে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। তবে প্রায় সবাই এ বিষয়ে একমত যে তাঁর জন্ম হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার প্রত্যুষে বা ভোরবেলায় তথা উষালগ্নে। প্রসিদ্ধমতে, সেদিন ছিল ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২০ এপ্রিল (১২ রবিউল আউয়াল)। আর তিনি ইহলোক থেকে চিরবিদায় নেন রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ দ্বিতীয় সোমবার অপরাহ্ণে বা গোধূলিলগ্নে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আগমন ও প্রস্থান একই দিনে, এ কথাই সর্বজনবিদিত সত্য।

তাঁর আগমন ঘটল আবরী বৎসরের প্রথম বসন্তরূপে খ্যাত মাহে রবিউল আউয়ালে। এতে করে কুল মাখলুকাতের গুল বাগিচায় নতুন প্রাণ স্পন্দনের জোয়ার দেখা দিলো। তাঁর সর্বোত্তম পবিত্র মাহাত্ম্য, অতুলনীয় নমনীয় প্রাণস্পর্শী। সুব্যবহার, মধুময় চিত্তাকর্শক বাচনভঙ্গী, কূল-কিনারাহীন জলধিসম, দয়াময় অতুলনীয় ক্ষমাশীলতা, দিগন্ত বিস্তুত দানশীলতা, গিরিশৈল শিখর পরিবেষ্টিত উদারতা এবং অবারিত মহানুভবতার বরকতে পাক-পাকে নিমজ্জিত পৃথিবী ও অন্ধকারে বিলুপ্ত প্রায় মানবতার ভাগ্যাকাশে প্রথম নির্মল ও নিদারুল বসন্তের পরশ লাগল।

তিনি গোটা পৃথিবীর পথহারা, দিশাহারা, ছন্নছাড়া, পাগলপারা জনসমুদ্রকে উপহার দিলেন আল্লাহ পাকের দেয়া হেদায়াতের অনির্বান মহান আল-কোরআনুল মাজিদ। এই কোরআনই হলো সর্বশেষ আসমানী কিতাব। এরপর আর কোনো আসমানী কিতাব নাজিল হবে না। এতে রয়েছে ইহকাল ও পরকাল বিষয়ক যাবতীয় দিকনির্দেশনা। এই নির্দেশনাগুলো তিনি তেইশ বছরের নব্যুওয়াতি জিন্দেগিতে পরিপূর্ণ রূপে বাস্তবায়ন করে গেছেন।

তিনি স্বীয় জবান মোবারকে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন: ‘হে বিশ্বমানবকূল! আমি তোমাদের মাঝে দু’টি বস্তু রেখে যাচ্ছি। এই দুটি বস্তু তোমরা যতদিন আঁকড়ে ধরে রাখবে, ততদিন কস্মিনকালেও পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হলো আল-কোরআনম্ মাজিদ এবং অপরটি হলো আল কোরআনের ব্যাখ্যা আমার সুন্নাহ বা জীবনাচার। এ জন্য প্রিয় নবীজি (সা.) এর অনুসরণ ও অনুকরণ অত্যাবশক মনে করা মানব জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও কর্তব্য।

কেননা, যারা তার অনুসরণ করবে, শুধুমাত্র তারাই নাজাত লাভ করবে। আর যারা তার অনুসরণ করবে না, তারা অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাবে। এর কোনো পরিবর্তন হবে না। তাই আসুন, মহা কবি শায়খ সা’দী (রহ:) এর সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও নবী প্রশস্তির ঝর্ণা ধারায় অবগাহন করি এবং বলি, ‘বালাগাল উলা বি কামালিহি, কাসাফাদ্দুজা বি জামালিহি, হাসুনাত জ্বামিয়ূ খিসালিহি, সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি’।

রাহমাতুললিল আলামিন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি প্রিয় নাম যা প্রত্যেক মুসলিম তার অন্তরে মহব্বতের সঙ্গে স্মরণ করে থাকে।

আমলের দিক দিয়ে কারো মধ্যে যত কমতিই থাকুক, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মহব্বত তার অন্তরে ততই গভীর। এ মহব্বতের কোন তুলনা নেই।

মুমিনের দিলে যে কারণে আল্লাহতাআলার মহব্বত গভীর, সে কারণেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মহব্বত গভীর হওয়া স্বাভাবিক।

আল্লাহপাক বলেন, ‘যারা ঈমানদার তাদের মহব্বত গভীর হওয়া স্বাভাবিক’ (সূরা বাকারা: ১৬৫)। আল্লাহপাক আবার বলেন, ‘হে রাসুল! আপনি বলে দিন যে যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাক, তা হলে আমার অনুকরণ করো, তা হলে আল্লাহই তোমাদের ভালোবাসবেন। ’

এ দু’টি আয়াত থেকে বোঝা গেল যে মুমিন আল্লাহকেই বেশি ভালোবাসেন এবং এ ভালোবাসা প্রকাশের একমাত্র পথ হলো রাসুলের অনুসরণ, অনুকরণ ও আনুগত্য।

কিন্তু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসা ছাড়া কি তাঁর আনুগত্য সম্ভব? তাই আল্লাহকে ভালোবাসার স্বাভাবিক পরিণতিই হলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা কি পরিমাণ থাকা উচিত সে কথা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন- ‘তোমাদের কেউ সত্যিকারের মু’মিন হবে না, যে পর্যন্ত আমি তার নিকট তার পিতা, পুত্র ও সকল মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় বলে গণ্য না হবো। ’

আল্লাহপাক পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র, ভাই-বোন আত্মীয়স্বজনকে ভালোবাসা কর্তব্য বলে জানিয়েছেন। কিন্তু কারো প্রতি ভালোবাসা যেন রাসূলের চেয়ে বেশি না হয়, বরং সবার চাইতে যেন রাসূলের প্রতি ভালোবাসা অধিকতর গভীর ও তীব্র হয়, সে কথাই এ হাদিসে বলা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো যে, আমাদের ভালোবাসা রাসূলের জন্য সবচেয়ে বেশি কি না তা যাচাই করার উপায় কি? এর হিসাব নেয়া কঠিন নয়।

অন্য কোনো মানুষের প্রতি ভালোবাসার দাবি পূরণ করতে গিয়ে যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাফরমানি করা হয় তাহলে বোঝা গেল যে রাসুলের প্রতি ভালোবাসা অন্যের তুলনায় কম। বাস্তবে এটাই দেখা যায় যে মানুষ প্রিয়জনের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে তাদের মঙ্গলের নিয়তেই এমন কিছু করে, যা করতে গিয়ে আল্লাহ ও রাসুলের হুকুম অমান্য করে।

রাসুলের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকলে সে এমনটা করবে না। যারা এমন বোকামি করে তাদের সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘যে অন্য লোকের দুনিয়া বানানোর জন্য নিজের অখিরাত নষ্ট করে, কিয়ামতের দিন সে সবচেয়ে বেশি নিকৃষ্ট বলে গণ্য হবে। ’

রবিউল আউয়াল
মু’মিনের দিলে রাসূলের প্রতি যে মহব্বতের দরিয়া প্রবাহিত হয় তাতে রবিউল আউয়াল মাসে যেন বান ডাকে। মহব্বতের এ জোয়ার এ মাসে সর্বত্রই টের পাওয়া যায়। সিরাতুন নবীর এত চর্চা আর কোন মাসে হয় না। বড় বড় মাহফিলে, মসজিদে, অফিসে, বাড়িতে, সর্বত্র এ মাসে অনুষ্ঠানের ব্যাপক আয়োজন হয় এবং তাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে শিক্ষণীয় বিষয় সম্পর্কে ইসলামী চিন্তাবিদ ও ওলামায়ে কেরাম মূল্যবান আলোচনা পেশ করেন।

এসব অনুষ্ঠানে সমবেতভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে পরিমাণ দরুদ ও সালাম পেশ করা হয় বছরের আর কোনো মাসে এতটা হয় না।

এ মাসটি এ ব্যাপারে এমন এক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যার কোনো তুলনা নেই। বিশেষ করে ১২ রবিউল আউয়াল ঘরে ঘরে যেভাবে মিলাদের অনুষ্টান করা হয়, এমনভাবে এক দিনে আর কোনো সময় করতে দেখা যায় না।

মিলাদ মাহফিল ও দোয়ার মাহফিল

মিলাদ অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে গিয়ে একটি বিষয় মুসলিম সমাজ, বিশেষ করে ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন মনে করছি। আমাদের দেশে সারা বছরই বিভিন্ন উপলক্ষে যেসব দোয়া মাহফিল হয়, তা সাধারণত মিলাদ মাহফিলের নামেই হয়ে থাকে। মৃতের জন্য দোয়া, নতুন বাড়ি বা দোকান উদ্বোধন উপলক্ষে দোয়া, বিয়ে, শাদি উপলক্ষে দোয়ার যে অনুষ্ঠান করা হয়, তা খুবই ভালো রেওয়াজ।

তবে মুসলমানদের সব কাজই আল্লাহর নামে ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা অনুযায়ী হওয়া উচিত। মিলাদ শব্দের অর্থ জন্মদিন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন হলো ১২ রবিউল আউয়াল। সে দিনের অনুষ্ঠানকে মিলাদ মাহফিল নাম দেওয়া অবশ্যই যুক্তিযুক্ত। আরব দেশগুলোতেও এ দিনটিকে ঈদে মিলাদুন্নবী হিসেবে পালন করা হয়। বিভিন্ন সময় মাহফিলে আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যে চর্চা হয় তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে অন্য কোনো সময়ের এসব মাহফিলকে ‘মিলাদ মাহফিল’ না বলে দোয়া মাহফিল বলাই যুক্তিসঙ্গত।

১২ রবিউল আউয়ালের গভীর তাৎপর্য

১২ রবিউল আউয়াল বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মদিবস হিসেবেই পালন করা হয়। অথচ তিনি এ তারিখে ইন্তেকালও করেছেন। কিন্তু এ দিনটি তাঁর মৃত্যুর দিবস হিসেবে কখনও পালন করা হয় না। সব দেশে ও সব জাতির মধ্যেই মহান ব্যক্তিদের জন্ম ও মৃত্যুদিবস পালন করার রীতি চালু আছে। জাতীয় নেতা, স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা ও বিভিন্ন দিক দিয়ে যারা দেশ বা জাতির জন্য গৌরবময় ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য তাদের জন্মদিবস যেমন পালন করা হয়, তেমনি তাদের মৃত্যুদিবসও পালন করা হয়ে থাকে।

কিন্তু বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুদিবস কেন পালন করা হয় না? যদি তাঁর জন্ম ও মৃত্যু দিবস একই দিনে না হতো তা হলে হয়ত তাঁর মৃত্যু দিবসও পালন করা হতো। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু একই দিনে হওয়ায় শুধু জন্মদিবস পালন করার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়টির মধ্যে কি কোনো তাৎপর্য নিহিত নেই?

যিনি হায়াত ও মওতের একমাত্র মালিক তিনি কি কোনো হিকমত ছাড়াই তাঁর সর্বশেষ রাসুলের জন্ম ও মৃত্যু একই দিনে নির্দিষ্ট করেছেন? দুনিয়ার আর কোনো মানুষ সম্পর্কে তিনি এ ব্যবস্থা করেছেন বলে আমার জানা নেই।

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেলায় এমন নজিরবিহীন ব্যবস্থা কেন করা হয়েছে তার আসল কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই জানেন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই খাতামুন নাবিয়্যিন অর্থাৎ শেষ রাসুল। তাঁর পরে আর কোনো রাসুল আসবেন না। তাঁর নবুয়্যাত ও রিসালাত চিরস্থায়ী।

হজরত আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আমিই সব আদম সন্তানের সর্দার হবো। আমি এ কথা গর্ব প্রকাশের জন্য বলছি না। সেদিন আদম ও সব নবী-রাসুল আমার পতাকাতলে থাকবেন। ’ আর আমি প্রথম ব্যক্তি যার কবর সবার আগে ফাটবে। এ কথাও আমি গর্ব হিসেবে বলছি না’।

মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর পরিচয় প্রকাশ করা। নবী-রাসুল প্রেরণের লক্ষ্য হলো মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। তাই আল্লাহকে পেতে রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর আদর্শ অনুসরণ করতেই হবে। অর্থাৎ রাসুলে আকরাম (সা.) যা করেছেন বা করতে বলেছেন, তা করতে হবে। আর যা করেননি বা করতে বারণ করেছেন, তা বর্জন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের উদ্দেশ্যে কোরআনের নির্দেশনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করাই ইসলামের মূল শিক্ষা।

এজন্য কোরআনের সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ৩১-এ স্পষ্টভাষায় বলা হয়েছে, ‘বলুন (হে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসবে, তবে আমার অনুকরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।’

হাদিস শরিফে আছে, ‘তোমরা কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হবে না, যতক্ষণ না আমি হব তার নিকট তার পিতা-পুত্র ও যাবতীয় সবকিছু হতে প্রিয়।’ (বুখারি, প্রথম খণ্ড: হাদিস: ১৩ ও ১৪)

অতএব নবীপ্রেম ও নবীর অনুসরণ মুমিন-মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য। এরই ভিত্তিতে শান্তির ধর্ম ইসলামের সাম্য ও ন্যায়নীতি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে সগৌরবে প্রতিষ্ঠা করা। এই শিক্ষা প্রদানই নবী বা রাসুল প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য; যা পবিত্র কোরআনে বারবার বিবৃত হয়েছে, ‘তিনি সে মহান প্রভু যিনি রাসুল প্রেরণ করেছেন, সঠিক পন্থা ও সত্য ধর্মসহযোগে, যাতে সে ধর্মকে প্রকাশ করতে পারেন সর্ব ধর্মের শিখরে।’ (সুরা-৪৮ ফাৎহ, আয়াত: ২৮)

প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। কোরআনে এসেছে ‘অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ প্রেরণ করেন। হে মুমিনরা! তোমরাও তাঁর প্রতি যথাযথ দরুদ ও সালাম পেশ করো’ (সূরা : আহজাব, আয়াত : ৫৬)। এমনকি, “আসমান যমীনের মাঝে দুআ ঝুলন্ত থাকে। তুমি তোমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পেশ করা পর্যন্ত তা উপরে ওঠে না।” -জামে তিরমিযী, হাদীস ৪৮৬।

নবী মুহাম্মাদ মুস্তাফা আহমদ মুজতাবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হলেন শেষ নবী, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, বিশ্বমানবতার জন্য রহমত স্বরূপ। তাঁর প্রতি লক্ষকোটি দরুদ ও সালাম:

“আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া’আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া’আলা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।
আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া’আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া’আলা আলি ইব্রাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ”। (বুখারী, মিশকাত পৃঃ ৮৬, হা/৯১৯)

অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ ও তার বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেভাবে আপনি ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করেছিলেন। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত সম্মানিত।
হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ ও তার বংশধরদের উপর বরকত নাজিল করুন, যেভাবে ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরদের উপর বরকত নাজিল করেছিলেন। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত সম্মানিত।”

উম্মতে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেদায়েতের জরিয়া হিসেবে আমার এ বিনীত প্রয়াস হে আল্লাহ আপনি মঞ্জুর করুন। আমীন।


লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, কলামিষ্ট, সমাজ সেবক ও রাজনীতিবিদ ।

Sharing is caring!



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



More News Of This Category


বিজ্ঞাপন


প্রতিষ্ঠাতা :মোঃ মোস্তফা কামাল
◑উপদেষ্টা মহোদয়➤ সোহেল সানি
◑নজরুল ইসলাম মিঠু ◑তারিকুল ইসলাম মাসুম ◑এডভোকেট হুমায়ুন কবির(আইন উপদেষ্টা)
প্রধান সম্পাদক : মোঃ ওমর ফারুক জালাল

সম্পাদক: মোঃ আমিনুল ইসলাম(আমিন মোস্তফা)

নির্বাহী সম্পাদক: শফি মাহমুদ

বার্তা ও বানিজ্যিক সম্পাদক: বজলুর রহমান
প্রধান প্রতিবেদকঃ লাভনী আক্তার

ইমেইল:ajsaradin24@gmail.com

টেলিফোন : +8802-57160934

মোবাইল:+8801725-484563, বার্তা সম্পাদক+8801716-414756
টপ