19 August- 2022 ।। ৪ঠা ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বিক্ষোভ-সরকারপক্ষীয় ফর্মূলা ছবি!

।।আহসান কবির।।

একালের নতুন এক ‘ভারত-বাংলাদেশীয়’ ফর্মূলা ছবি ‘বিক্ষোভ’! মহম্মদ হান্নান পরিচালিত বিক্ষোভ (মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৪ সনের ৯ সেপ্টেম্বর) নামে আরও একটি ‘এদেশীয়’ ছবি ছিল যেটিতে অভিনয় করেছিলেন সালমান শাহ ও শাবনুর, যে ছবির একটি গান আজও জনপ্রিয়-‘একাত্তরের মা জননী কোথায় তোমার মুক্তি সেনার দল’? নতুন বিক্ষোভ ছবির সাথে জড়ানো হয়েছে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন এবং ছাত্রছাত্রীদের রাস্তায় নামার সেই পরিচিত ঘটনাকে। পরোক্ষভাবে জড়ানো হয়েছে সরকারি ও বিরোধী দলের সংঘাতকে! এই ছবিতে বিরোধী দলের নাম ডিজেপি যার পূর্নরূপ-দেশ জনতা পার্টি! এক খলনায়কের সংলাপ আছে এমন-‘আমার দলের নেতা পলিটিক্সকে ডিফিকাল্ট করে দিয়েছিলেন’!

বিক্ষোভ অবশ্য কোন ডিফিকাল্ট ছবি নয়,নিতান্তই এক ফর্মূলা ছবি যার শুরুটা এক ফাঁসির আসামীর ফাঁসির প্রস্তুতি নিয়ে। জানা যায় যার ফাঁসি হবে তার নাম ছাত্রনেতা শান্ত। ফাঁসি নিয়ে সরব দেখানো হয় মানুষকে,দেখা যায় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর খবর প্রচারের ব্যস্ততা। এর ভেতর উদয় হয় এই সিনেমার নায়িকা, যিনি ভয়েজ নামের টেলিভিশনে লাইভ সাক্ষাৎকার দিতে ছুটে যান। সিনেমার মূল নায়িকা যিনি প্রভাষক একটি কলেজের,তার ভাষ্যে ক্রমশঃ জানতে পারে দর্শক,শান্ত কেন তিনজনকে খুন করেছিল!
শান্ত নিতান্তই এক শান্তপ্রিয় ছেলে যার গলার স্বরও বাচ্চাদের মতো। কলেজে এসেই সে ম্যাডামের প্রেমে পরে যায় যদিও তাকে ভালোবাসে এই ছবির দ্বিতীয় নায়িকা। শান্তর কলেজের বন্ধু জামসেদ যে কিনা অর্থকষ্ট নিয়ে পড়াশোনা করে,জামসেদের বাবা চায় সে ডাক্তার হোক। শান্ত তার বান্ধবীকে দিয়ে ম্যাডামকে ভালোবাসার প্রস্তাব পাঠায়। ম্যাডাম আফ্রি জানিয়ে দেন শিক্ষক ছাত্র সম্পর্ক ছাড়া শান্তর সাথে আর কোন সম্পর্ক সম্ভব না। এরপর শান্ত ম্যাডাম আফ্রির মুখোমুখি হলে জানা যায় আরেক গল্প। সৎ পুলিশ অফিসার (সাব ইন্সপেক্টর) মাসুদের সাথে ‘প্রধান গ্রæপের’ লোকজনের সাথে সংঘাত বাধে। সে নম্বর প্লেটবিহীন গাড়ি আটক করে আর গাড়িতে পাওয়া যায় কোটি টাকা। গাড়ি ও টাকা জব্দ করে প্রধান গ্রæপের লোকদের আটক করলে মাসুদকে ডেকে পাঠান প্রধান গ্রপের দেশীয় প্রধান রজতাভ দত্ত। রজতাভের দুই সহযোগি বড়দা মিঠু ও শিবা শানু। এরা সাব ইন্সপেক্টর মাসুদকে মেরে ফেলে সড়ক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিলেও ম্যাডাম আফ্রি তার স্বামীর এমন মৃত্যু বিশ্বাস করে না। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট অবশ্য মাসুদের মৃত্যুকে মেনে নেয়!

অন্যদিকে শান্তর বন্ধু জামসেদ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে এটা নিয়ে আন্দোলনে নামে শান্তর কলেজের ছেলেমেয়েরা। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনকে সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ দিতে চায় দেশ জনতা পার্টি ওরফে ডিজেপি।ডিজেপি নেতারা শান্তর বাসায় যায়। তাকে দলে টানার চেষ্টা করে। শান্ত ও তার বাবা জানিয়ে দেয় নির্দলীয় নিরাপদ চাই সড়ক আন্দোলন অরাজনৈতিক এবং শান্ত এর বিনিময়ে কোন টাকা নেবে না। এরপর ডিজেপির নেতারা ম্যাডাম আফ্রিকে ডেকে পাঠায় এবং ম্যাডামকে সেখান থেকে উদ্ধার করে শান্ত। এরপর ম্যাডামের বাসায় কেউ এলে তিনি সহজেই দরোজা খুলে দেন। তাকে নিয়ে যায় রজতাভের তিন সহযোগি। শান্ত ও তার ছেলেপেলে ম্যাডামকে বাসায় খুঁজতে এসে না পেলে বুঝতে পারে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর শান্ত ছুটে যায় রজতাভর আস্তানা থেকে ম্যাডামকে উদ্ধার করতে। ম্যাডাম আহত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পরলে শান্ত বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। এক তাজিয়া মিছিলের কাফেলার ভেতর পালাতে থাকা শিবা সানু,বড়দা মিঠু আর ডনকে খুন করে সে! এরপর পুলিশ এসে শান্তকে ধরে নিয়ে যায়। বিচারে তার ফাঁসি হয়। ম্যাডামের লাইভ শেষ হলে দেখা যায় শান্তকে যমটুপি পরানো হয়েছে। সিনেমার গৎ অনুসারে হতে হতেও শান্তর ফাঁসি হয় না।

এই ছবির প্রচারনায় বলা হয়েছে ২০১৮ সালের জুলাইতে কলেজ ছাত্রী দিয়া খানম ও ছাত্র রাজীবের মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের ঘটনা নিয়ে নির্মিত ছবি। ফর্মূলা বা মারদাঙ্গা ছবির সাথে এই ঘটনার সংমিশ্রন ভালো হয় নি। ছাত্রছাত্রীদের দাবী ছিল অরাজনৈতিক এবং এটা সরকার পতনের আন্দোলন ছিল না। ছিল না বিরোধী দলের সাথে সরাসরি সংশ্রব যা সিনেমায় দেখানো হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে কোন খুনের ঘটনা ঘটে নি এবং মূল নেতাদের কাউকে গ্রেফতার করা হয় নি। বরং ম্যাডামের সাথে ছাত্রের প্রেম,তিনখুনের দৃশ্য সহ অনেক কিছু সরাসরি হিন্দি ছবি থেকে টুকলিফাই করা হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের সাথে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে বিরোধী দলকে বোঝানো হয়েছে যার নাম দেশ জনতা পার্টি। এমন কী এই দলের প্রধান বাইরে থাকে তেমনই বোঝানো হয়েছে। এই ছবির মাধ্যমে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের সেই আন্দোলনকেই খাটো করা হয়েছে।

১০ জুন ২০২২ এ ৩০টি হলে মুক্তি পেয়েছে বিক্ষোভ। এই ছবির কাহিনীকার ও পরিচালক শামীম আহমেদ রনি। আইটেম সং ছাড়া মারদাঙ্গা ছবির সব শাখাই তিনি সচল রেখেছেন বিক্ষোভে। শাপলা মিডিয়ার ব্যানারে নির্মিত এই ছবির প্রযোজক সেলিম খান যিনি কি না ভয়েজ টিভিরও মালিক। ছবির নায়ক অর্থাৎ শান্তর ভ‚মিকায় অভিনয় করেছেন সেলিম খান তনয় শান্ত খান ও শিক্ষক আফ্রি খান এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পশ্চিম বাংলার শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়। বিদেশে থাকা দলীয় প্রধানের ভূমিকায় বলিউডের রাহুল দেব এবং দেশে থাকা দেশ জনতা পার্টির মূল নেতার ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করেছেন পশ্চিম বাংলার রজতাভ দত্ত। রজতাভের দুই সহযোগির চরিত্রে ভালো অভিনয় করেছেন শিবা সানু ও মাহমুদুল ইসলাম মিঠু(বড়দা মিঠু) শান্তর বাবা ও মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সাদেক বাচ্চু ও সাবেরি আলম। অভিনেতা ও গুনী নাট্যজন সাদেক বাচ্চুর মৃত্যুর পর তার সংলাপ ডাবিংয়ে অংশ নিয়েছেন অভিনেতা সাহেদ আলী। এই ছবির সংলাপ লিখেছেন দেলোওয়ার হোসেন দিল।
ছবির পোস্টারে সঙ্গীত আয়োজক হিসেবে আকাশ ও ইমরানের নাম আছে। বানিজ্যিক ছবি বিকশিত হয় ছবি ব্যবসা সফল হলে। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া বিক্ষোভ নামের ছবিটি ব্যবসা সফল ছিল। ভারত বাংলাদেশীয় সংমিশ্রণের এইনতুন বিক্ষোভ ব্যবসা সফল হবে কিনা সেটা জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

জয় হোক বাংলা ছবির।

Sharing is caring!





More News Of This Category


বিজ্ঞাপন


প্রতিষ্ঠাতা :মোঃ মোস্তফা কামাল

প্রধান সম্পাদক : মোঃ ওমর ফারুক জালাল

সম্পাদক: মোঃ আমিনুল ইসলাম(আমিন মোস্তফা)

নির্বাহী সম্পাদক: এ আর হানিফ
কার্যালয় :-
৫৩ মর্ডান ম্যানশন (১২ তলা)
মতিঝিল, ঢাকা-১০০০

ইমেইল:ajsaradin24@gmail.com

টেলিফোন : +8802-57160934

মোবাইল:+8801725-484563,+8801942-741920
টপ