25 October- 2021 ।। ৯ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

বিশ্ব শিক্ষক দিবস এবং আমার বাবা

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দিনটি বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় I

বাবা-মা কিংবা পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে, ব্যক্তিকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন একজন শিক্ষক, যাকে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর।

আজ মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব শিক্ষক দিবস। যাদের অবদান ব্যক্তি জীবনে অনস্বীকার্য। আজকের এদিনে পৃথিবীর সকল শিক্ষককে জানাই শ্রদ্ধা।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে পুরো বিশ্বই যেন থমকে ছিল, থমকে ছিল শিক্ষাব্যবস্থাও। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও শিক্ষা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এ বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, “শিক্ষা পুনরুদ্ধারের কেন্দ্রবিন্দুতে শিক্ষক”। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হবে।

১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর তারিখ বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে “বিশ্ব শিক্ষক দিবস”। এই দিবসটি শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করার জন্য পালন করা হয়।

ইউনেস্কোর মতে, বিশ্ব শিক্ষক দিবস শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পালন করা হয়। বিশ্বের ১০০টি দেশে এই দিবসটি পালিত হয়ে থাকে।

পবিত্র কোরআনে নাজিলকৃত প্রথম আয়াতে জ্ঞানার্জন ও শিক্ষা সংক্রান্ত কথা বলা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘পড়, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একবিন্দু জমাট রক্ত থেকে। পড়, আর তোমার প্রতিপালক পরম সম্মানিত। যিনি কলমের দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না (আলাক, ১-৫)।

আল কোরআনের শিক্ষার আলোকে জ্ঞানার্জনের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন- ‘প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর বিদ্যার্জন করা ফরজ (ইবনু মাজাহ :২২০)।’

একজন প্রাজ্ঞ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সত্যিকারভাবে শিক্ষিত শিক্ষক সমাজ বদলে একটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। আদর্শ শিক্ষকই শুধু আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করতে পারেন। এ জন্যই শিক্ষকতাকে অপরাপর পেশার মানদণ্ডে পরিমাপ করা যায় না বলে অনাদিকাল থেকে এটি একটি সুমহান পেশা হিসেবে সমাজ-সংসারে পরিগণিত। কারণ জ্ঞানই মানুষের যথার্থ শক্তি ও মুক্তির পথনির্দেশ দিতে পারে। এ মর্মে নবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘দুই ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কারও পদ-গৌরব লোভনীয় নয়। তা হলো- ১. ধনাঢ্য ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেছেন এবং তা সৎপথে ব্যয় করার ক্ষমতা দিয়েছেন; ২. ওই ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ বিদ্যা দান করেছেন এবং সে অনুসারে সে কাজ করে ও অপরকে শিক্ষা দেয় (বুখারি :৭১)।

শিক্ষা অনুযায়ী মানব চরিত্র ও কর্মের সমন্বয় সাধনই হচ্ছে রাসুলের (সা.) তাগিদ। নিজে শিক্ষা অর্জন করার পরক্ষণেই অপরকে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত ও চরিত্র গঠন করার দায়িত্বও শিক্ষকের। রাসুল (সা.) বলেন- ‘আল্লাহর পরে, রাসুলের পরে ওই ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা মহানুভব, যে বিদ্যার্জন করে ও পরে তা প্রচার করে (বুখারি :৪৬৩৯)।

বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও দানবীর, ধর্মীয় নেতা, মোসলেম আলী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান সাতুরিয়া ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম কারিগারি স্কুল অ্যন্ড কলেজ এবং ও শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হক রির্চাস ইনস্টিটিউট এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, খিলগাঁও মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, খিলগাঁও মডেল হাই স্কুল এবং খিলগাঁও মডেল কলেজ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ঝালকাঠী জেলার রাজাপুর থানার সাতুরিয়া হামিদিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মরহুম আলহাজ্ব কে.এম আবদুল করিম আমার বাবা I

‘বাবা’। ছোট্ট একটি শব্দ। অথচ এর ব্যাপকতা বিশাল। আরবিতে ‘আবুন’। হিন্দি ও উর্দুতেও অনেক সময় এভাবেই বাবাকে ডাকা হয়। ডাকটির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে গভীর ভালোবাসা, নিরাপত্তা, নির্ভরতা। সাহিত্যে, গীত-আনন্দ ও লোককথা শিল্পকর্মে বাবা স্থান করে নিয়েছেন এক দায়িত্বশীল স্নেহময় পুরুষ হিসেবে। সন্তানের সুখ-দুঃখে বাবা তাকে বুকে চেপে রাখেন। ঘুঁচিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন সন্তানের সব কষ্ট।

বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক বন্ধুত্বেরও। শাসন আর বন্ধুত্বের মিলনে পরিপূর্ণতার মধ্যেই বেঁচে থাকে বাবার স্বপ্ন, জীবনের সফলতা আর সভ্যতার অনন্য অর্জন সামাজিকতা। পারিবারিক বন্ধনের ঐতিহাসিক শিক্ষা আদি পিতা আদম (আ.) থেকে যে ঐক্যতানের সৃষ্টি করেছে, পৃথিবীর সব ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতি এটাকে অস্তিত্বের শিকড় হিসেবে ধরেছে। এ শিকড়েই শান্তি ও আধুনিক উন্নয়ন ও মানবিক সমাজের ভিত্তি রচিত হয়েছে।

পৃথিবীর সব বাবা সফলতার জন্য তাদের নিজেদের হিরো বানিয়েছেন। হজরত ইসহাক ও ইসমাইল (আ.)-এর কাছে আদর্শ ছিলেন তাদের পিতা আবুল আম্বিয়া ইবরাহিম (আ.)। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই ইসরাইলি নবুয়তি ধারা ও ইসমাইলি ধারার সৃষ্টি হয়। বিশ্বের সব ক্ষেত্রে সফলদের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো না কোনোভাবে পিতার ছায়া জীবনে রেখাপাত করেছে।

আমরা বিশ্বকবি রবীন্দ্রাথ ঠাকুর আর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখব, অবিভাবকত্ব জীবন গঠনে কত অপরিসীম।

রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ঐতিহাসিক জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারে জন্ম নেওয়ার পর থেকে শিক্ষাজীবন এমনকি রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠা এবং এর পরবর্তী সময় পর্যন্ত পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিম-লেই থেকেছেন এবং স্বীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে নিজের সব সৃষ্টিতে ধারণ করেছেন, যা এখনও সমাজকে সমানভাবে আলোকিত করছে।

অপরদিকে জাতীয় কবির বেড়ে ওঠা ছিল অনেকটাই অভিভাবকহীনভাবে। যে সময় তার পিতার হাত ধরে চলার কথা, পিতার স্নেহে পৃথিবীর ভালোবাসার ঘ্রাণ নেওয়ার কথা, তখনই জীবনের প্রয়োজনে কখনও ইমাম, মাজারের সেবক অথবা লেঠো বাহিনীতে যোগ দিতে হয়েছিল। দিকভ্রান্তহীন জীবনে তার বিদ্রোহী হয়ে ওঠার বাস্তবতা, ভিন্ন সংস্কৃতিক আবহের বিবাহসহ পরিবারিক কাঠামাতে দ্বান্দ্বিকতার যে বিস্তর বিবরণ আমরা পাই, তাতে অনেকেই মন্তব্য করেছেন পরিবারিক কাঠামোতে পিতার মতো দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো হিতাকাক্সক্ষী সামনে থাকলে হয়তো কবির জীবনটাই অন্যরকম হতে পারত। অথচ নিজের জীবনের ঘূর্ণায়নে নজরুল ঠিকই তার সন্তানদের জন্য একজন মূর্তিমান বটবৃক্ষ ছিলেন। তিনি ছন্নছাড়া থাকলেও সন্তানদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যপানে উদ্দেশ্য করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। বুলবুলের অল্পবয়সের মৃত্যুর পর লেখা রুবাইয়াতে হাফিজ এক অনবদ্য সৃষ্টি। কবিপুত্র সব্যসাচী তার পিতার স্মৃতিতে লেখা ‘বাবার স্মৃতি’তে বিশ্বাসের দ্বান্দ্বিকতার মধ্যেও তাদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পিতা নজরুল ইসলামের চেষ্টার অনেক উদাহরণ তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ছোট সময়েই রবীন্দ্রনাথ নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় লিখেন এখনও তো বড় হইনি আমি/ছোট আছি ছেলেমানুষ বলে/দাদার চেয়ে অনেক মস্ত হব/বড়ো হয়ে বাবার মতো হলে। (কবিতা : ছোটবড়ো)।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা ছেলে রথীন্দ্রনাথের লেখায় কবি ও লেখক বা জমিদার পরিচয়ের বাইরেও তিনি পিতা হিসেবে কত বড় ছিলেন তা বিস্তারিত লিখেছেন।

বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’-এর বাবা চরিত্রের সেই বাবার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত চলচ্চিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় অসাধারণ এই বাবাকে। অভিনেতা রবার্তো বেনিনির তুলে ধরা চরিত্রটির নাম গুইডো। শিশুসন্তানের নাম যশোয়া। জার্মান সেনারা ট্রেনে করে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যায় পিতাপুত্রকে। অসহনীয় যন্ত্রণার জীবন। যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যু। কিন্তু ছেলেকে এই পরিস্থিতি এতটুকু বুঝতে দেননি বাবা। ছেলেকে তিনি বলার চেষ্টা করেন, এটা একটা খেলা। যে দ্রুত বেশি পয়েন্ট পাবে, তাকে সত্যিকারের একটি ট্যাঙ্ক উপহার দেওয়া হবে। বাবা ছেলেকে বলেন, সে যদি মায়ের কাছে যেতে চায়, খিদে পেলে খাওয়ার জন্য কান্না করে, আর ঘরে লক্ষ্মী ছেলের মতো লুকিয়ে না থাকে, তাহলে পয়েন্ট কাটা যাবে। এভাবে বাবা করুণ মৃত্যুর শিকার হলেও, কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের আতঙ্ক থেকে সন্তানকে শতভাগ রক্ষা করেন। এটাই হলো সন্তানের জন্য বাবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

ইসলামি জীবনদর্শনে বাবা-মা পরিবারের মূল ভিত্তি। তাদের জন্মের আগে থেকে জন্ম, বড় হওয়ার শিক্ষা, এমনকি বিবাহ করানো পর্যন্ত ধর্মীয় দায়িত্ব বলে নির্দেশনা প্রদান করেছে। এ স্থানেই পশ্চিমা দর্শনের সঙ্গে যত বিপত্তি। সন্তানকে অনেক রাষ্ট্রই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি মনে করে।

অনেক রাষ্ট্র সন্তান জন্ম দেওয়াকে বায়োলজিক্যাল চাহিদার অংশ মনে করে। এখানে নৈতিকতা বা বিবাহের কোনো সামাজিক স্বীকৃতির প্রয়োজন মনে করেন না।

ব্রিটেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার বান্ধবীর সঙ্গে দীর্ঘদিন লিভটুগেদার করার পর বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পশ্চিমা বিশ্বে বিষয়টি তেমন আলোচনা বা সামাজিক বিষয় না হলেও মুসলিম বিশ্ব এমনকি হিন্দু, বৌদ্ধ এমনকি ইহুদি ধর্মেও তা কল্পনা করা যায় না।

শুধু বায়োলজিক্যাল বিষয় বলে সন্তান জন্ম দিলে আজকের পৃথিবী সভ্যতার এ চূড়ায় উঠতে পারত কি-না এ ব্যাপারে বিতর্ক আছে। এক গবেষণা দেখা গেছে, ইউরোপে প্রায় ৫৭ শতাংশ সন্তান পিতার পরিচয়হীন। আমেরিকা এমনকি জাপানেও এ হার কম নয়। ইদানীং পিতামাতার এ সামাজিক বন্ডিং মুসলিম বিশ্বেও ঢিলেঢালা হওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পৃথিবীতে এক সময় মানুষ্য জাতি অস্তিত্বের সংকটে পড়বে, সন্দেহ নেই।

আর এ ধারা অব্যাহত থাকলে পৃথিবী অভিভাবকশূন্য এক উচ্ছৃঙ্খল মানব জনগোষ্ঠী দেখতে পাবে, যাদের মধ্যে অভিভাবকত্ব, সামাজিক মান্যতা আর শ্রদ্ধার বিপরীতে মানুষ নামের কিম্ভূতকিমাকার এক জাতি। যার সঙ্গে চতুষ্পদ জন্তুর কোনো পার্থক্য থাকবে না। আরও বেশি অবনতির আগেই বিশ্ববিবেককে পিতামাতার অভিভাবকত্বপূর্ণ পারিবারিক কাঠামোতে ফিরে আসতে হবে। এমন সন্তানের অভিভাবক হতে হবে যারা পিতামাতার জন্য হাত তুলে বলবে, ‘হে প্রভু! তুমি আমার জন্মদাতা-ধাত্রীর সঙ্গে এমন ব্যবহার কর, যেরূপ আদর-সোহাগ তারা আমাদের শিশু অবস্থায় করেছে।’

আমার বই পড়ার অভ্যাস গড়ার পেছেনে যার ভুমিকা সবচেয়ে বেশী তিনি হলেন আমার মরহুম বাবা। যখন প্রাইমারীতে পড়তাম তখন দেখতাম বাবা বাইরে থেকে বাড়িতে যখনই আসতেন সাথে করে পত্রিকা বা বই নিয়ে আসতেন। সেই তখন থেকে আজ অবধি বই পড়ার অভ্যসটা ধরে রেখিছি এখনো।

এছাড়া খিলগাঁও চৌরাস্তার পাশে খিলগাঁও ইসলামী পাঠাগার ও সমাজকল্যান পরিষদ এই প্রতিষ্ঠানটিও আমার বই পড়ার আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেখান নানা পত্রিকা থাকত। ইসলামিক বই সহ নানা প্রকার গল্পের বই থাকতো।

বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের সেরা বইগুলো নিয়ে গড়ে উঠেছে খিলগাঁও ইসলামী পাঠাগার।হুমায়ূন আহমেদ, মুহম্মদ জাফর ইকবাল তো বটেই, মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা সহ বিদেশী সব থ্রিলার বইয়ের অনুবাদেরও বিশাল সংগ্রহ আছে লাইব্রেরিটিতে। বাতিঘর, রোদেলা প্রকাশিত থ্রিলারসহ বাংলায় অনুবাদকৃত সকল থ্রিলার, একইসাথে আছে পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত লেখকদের সব বই। সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশ, আশাপূর্ণা, সুচিত্রাসহ প্রায় সকল জনপ্রিয় লেখকের বই।

বাংলা ধ্রুপদী সাহিত্যেরও বিশাল সংগ্রহ আছে। হাসান আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কিংবা বর্তমান সময়ের শাহাদুজ্জামান বা শহিদুল জহিরের সব বই আছে পাঠাগারে।

সামাজিক অবক্ষয় রোধে নৈতিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। সামাজিক অবক্ষয় রোধ করতেই স্কুল-কলেজের ছাত্রদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।

ইসলামী ফাউন্ডেশন এর সিরাতুন্নবী সা. এর মেলা থেকে পাঠাগারে প্রচুর বই কিনা হতো। ইসলামী ফাউন্ডেশনের গল্পের বইগুলির অন্যরকম মজা ছিল। বিশেষ করে নবী রাসুলের কাহীনি গুলো। হায়রে কোথায় সেই দিনগুলি!

খিলগাঁও ইসলামী পাঠাগার ও সমাজ কল্যান পরিষদ ঢাকার প্রতিষ্ঠাতা এবং ঢাকার তাফসীরুল কুরআন মাহফিলের প্রবর্তক “শহীদ আবুল কাশেম” এর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

আমার কাশেম ভাই।কত দিন, কত রাত, কত বছর একসাথে ওঠা বসা খাওয়া দাওয়া। ঘন্টার পর ঘন্টা পায়ে হেঁটে রিক্সায় করে শুধু মানুষের দ্বারে দ্বারে দীনের দাওয়াত ।গরীব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো কিন্তু খাওয়ার কোন খবর নেই। এই ছিল আমার ভাইয়ের কাজ।

কিন্তু আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কেন এই ভালো মানুষ টিকে দিনে দুপুরে শহীদ হতে হলো। ১৯৯৭ সালের ২রা অক্টোবর তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন।

কিছু মানুষ মারা যান না ,তারা বেঁচে থাকে, তাদের স্বপ্নেরা বেঁচে, কারণ মৃত্যু শারীরিক, স্বপ্নরা চিরসবুজ। মৃত্যুর পর বাঁচতে চাইলে মানুষের মতো মানুষ হওয়াটা জরুরী।

হে আল্লাহ প্রিয়জন শহীদ আবুল কাশেম ভাইকে তোমার রহমতের ছায়াতলে ঠাঁই দিও। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর জীবনের সকল গুনাহ মাফ করে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন।

বাবারা অনেক সময় একটু কঠোর হয়। আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, শাসক হতে হলে বাবার কাছে যেও আর প্রেয়সী হতে হলে মাকে দেখ। প্রতিটি পরিবারেই মনে হয় এ অবস্থা। বাবার আদরের শাসনের বিপরীতে মায়ের আঁচলে শুধু ভালোবাসা। পড়ায় ফাঁকি দেওয়ার চিন্তা, গোপনে বাইরে খেলতে যাওয়ার ব্যাপারে ভয় হতো শুধু বাবাকে। না জানি জেনে যান?

যত কষ্টই হোক, সকালে ঘুম থেকে উঠে জামাতে নামাজ আদায় আর কোরআন তেলাওয়াতে করা, ভালো রেজাল্ট করার ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই, আচার-আচরণের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ এলে পিটুনির ভয় থেকে রক্ষা নেই, সে তো শুধু একজনই করতেন ‘বাবা’। এত শাসনের মধ্যেও আমাদের বাজার থেকে নতুন কিছু এনে দেওয়ার আর্জি ও প্রতিদিনের বায়না তো বাবার কাছেই ধরতে হতো। তবে টাকা চাইলে অবশ্যই মায়ের মধ্যস্থতা। এত শাসন আর আদরের মাধ্যমে আমার জন্মদাতা পিতা একজন আদর্শ মানুষ গঠনের চেষ্টা করেছেন।

বাবা সর্বদা আদর্শ আবেদ ও আদর্শ নাগরিককে সমান ও একসঙ্গে করে উচ্চারণ করতেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার কারণে এলাকায় তার হাজারও ছাত্রছাত্রী। তাদের অনেকের কাছে সবার নামাজ-রোজা ও আদব-কায়দা শিখানোর ব্যাপারে একটু কঠোর মনোবৃত্তির কথা শুনেছি।

বাবার স্মৃতিময় চেহারা চোখের পর্দায় ভেসে উঠলে কিছুটা অনুধাবনে আসে তিনি কতই না আদর্শ পিতা ছিলেন, আদর্শ শিক্ষক ছিলেন। ছোট সময় আমাদের আদব ও নীতি শিক্ষাদানের মাধ্যমে স্বাধীন দেশের আদর্শ নাগরিক তৈরির বীজ বুনেছিলেন তা কি জানতাম? তার বুনা বীজ আজ অনেক বড় হয়েছে একেবারে ৪৫। এ বয়সে মনে হয় যে, আদর্শ নাগরিক তৈরির প্রচেষ্টা ছিল তার আবেগ আর হৃদয়ে, আমি কি সেরকম হতে পেরেছি? পিতার ঋণ শোধাতে চাওয়ার সাহস কারও নেই, তবে তার দেখানো পথে আমাকে পরিচালিত কর হে পরওয়ারদিগার, মহামহিম।

কোনো চাওয়া-পাওয়া নিয়ে যখন আমার বাচ্চা আমার বুকে লাফিয়ে পড়ে, তখন বাবাকে খুব মনে পড়ে। বিখ্যাত ওই গানটির কয়েকটি চরণ বারবার আবেগকে উদ্বেলিত করে : কাটে না সময়, যখন আর কিছুতে/বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না/জানালার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা/মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না/আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়।

আমার বাবা আলহাজ্ব কে.এম আবদুল করিম ১১ নভেম্বর ২০১৬, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টায় ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি আর কখনও আমাদের মাঝে আসবেন না, চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

আলহাজ্জ্ব কে.এম আবদুল করিম ( রাহিমাহুল্লাহ ) এলাকায় গড়ে তুলেছেন বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে সাতুরিয়া ইঞ্জিনিয়ার এ,কে,এম রেজাউল করিম কারিগরি স্কুল এন্ড কলেজ, আমড়াঝুড়ি জামিয়া ইসলামীয়া বহুমুখী দাখিল মাদ্রাসা, কে,এম, আ: করিম জামিয়া ইসলামীয়া এতিমখানা অন্যতম।

এছাড়াও শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, মাওলানা আ: রহীম, (র:) স্মৃতি পাঠাগার, মোস্তফা হায়দার একাডেমী, পূর্ব আমড়াঝুড়ি বায়তুল মামুর জামে মসজিদ, সাতুরিয়া খানবাড়ী জামে মসজিদ, উত্তর তারাবুনিয়া মোল্লাবাড়ী জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠির মানোন্নয়নে ভূমীকা রেখেছেন। সম্প্রতি কাউখালি শহরে দৃষ্টি নন্দন ফোয়ারা ও বিশ্রামাগার স্থাপিত হয়েছে মোসলেম আলী খান ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতায়। ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলায় তিনি বাংলা অনুবাদ কোরআন শরীফ বিতরন করেন।

সেবামূলক কাজ পরিচালনার জন্য মোসলেম আলী খান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময়ে গরীব ছাত্র-ছাত্রী ও মসজিদের ইমামদের মধ্যে আর্থিক সহয়তা প্রদান করেছেন। রাজাপুর শহরে আর্সেনিক মুক্ত বিশুদ্ধ পানির জন্য তিনি সম্প্রতি ইসরাব নামক একটি এনজিওকে ঋন দিয়েছেন।

ভয়াবহ ঘুর্নঝড় সিডরের পরে মোসলেম আলী খান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের ত্রান তৎপরতা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। এ সময় তার প্রতিষ্ঠিত মোসলেম আলী খান ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কাউখালি, ভান্ডারিয়া, ঝালকাঠি সদর, রাজাপুর, কাঠালিয়া, পিরোজপুর, পটুয়াখালির কলাপড়া, বরগুনার পাথরঘাটা এবং বাকেরগঞ্জ থানায় ৩ হাজার ৬শ ৭০ জন দূর্গত মানুষের মধ্যে শাড়ি-লুঙ্গি, শীতের কাপড়, শুকনো খাবার, হাড়ি-পাতিল,থালাবাসন, খাবার স্যালাইন, ঔষধ ও নগদ অর্থ বিতরন করেন। কুরবানীতে তিনি কাউখালি ও ভান্ডারিয়ার প্রতিটি ইউনিয়নে এবং রাজাপুর ও ঝালকাঠিতে পশু কোরবানী দিয়ে সিডর আক্রান্ত ২ হাজার দুস্থ মানুষের মধ্যে গোশত বিতরন করেছেন। সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি আর্থিক সাহায্য করেছেন। যার মধ্যে কাউখালির কেউন্দা স্কুল ও সাতুরিয়া রহমIতয়া দাখিল মাদ্রাসা অন্যতম। এসব এলাকায় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কিছু মসজিদেও তিনি আর্থিক সহয়তা প্রদান করেন।

আলহাজ্ব কে, এম, আব্দুল কারীম (রহীমাহুল্লাহ) এর স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠিত আলহাজ্ব কে,এম,আব্দুল কারীম (রহীমাহুল্লাহ) ট্রাস্ট পরিচালিত বাইতুর রহমত জামে মসজিদ, আলহাজ্ব কে, এম, আব্দুল কারীম (রহীমাহুল্লাহ) একাডেমি, আলহাজ্ব কে,এম, আব্দুল কারীম (রহীমাহুল্লাহ) হাফিজিয়া মাদরাসা ও ইয়াতিমখানা, মারকাজুল উলুম কারীমিয়া মাদরাসা, খান মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার শিশু-কিশোর সংগঠন রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে কাজলারপার উত্তরপারা (হালটপার) যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২৩৬, নিজস্ব সম্পত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত “স্কুল ও মাদরাসা শিক্ষার সমন্বয়ে এক আধুনিক মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র”।যে প্রতিষ্ঠানটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানবতার কল্যাণে, দক্ষ, যোগ্য মানবসম্পদ গঠনে কাজ করে যাবে।

বাবা তোমার জন্য অন্তরের অন্তস্তল থেকে দোয়া। তোমাকে যেন আল্লাহ বেহেশতের সর্বোচ্চ মর্যাদায় স্থান দেন। পৃথিবীর হাজারও বাবার মর্যাদা উভয় জাহানে বুলন্দ হোক। তাদের দেখানো পথে দিশায় আমরা সব সন্তানরা চলতে চাই। ব্যক্তি ও সমাজকে কিছু দেওয়ার প্রচেষ্টায় রত হতে চাই।
লেখক- সেবক ও রাজনীতিবিদ,কলামিস্ট
প্রতিষ্ঠাতা শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক রিসার্চ ইনস্টিটিউট’

Sharing is caring!





More News Of This Category


বিজ্ঞাপন


প্রতিষ্ঠাতা :মোঃ মোস্তফা কামাল

প্রধান সম্পাদক : মোঃ ওমর ফারুক জালাল

সম্পাদক: মোঃ আমিনুল ইসলাম(আমিন মোস্তফা)

নির্বাহী সম্পাদক: এ আর হানিফ
কার্যালয় :-
৫৩ মর্ডান ম্যানশন (১২ তলা)
মতিঝিল, ঢাকা-১০০০

ইমেইল:ajsaradin24@gmail.com

টেলিফোন : +8802-57160934

মোবাইল:+8801725-484563,+8801942-741920
টপ