21 October- 2020 ।। ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

কাজের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন মাহবুবে আলম

-শ ম রেজাউল করিম

৭১ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় অনন্তলোকে পাড়ি জমালেন। উপমহাদেশে তিনিই সর্বোচ্চ সময় রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে সংস্কৃতিমনা, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক এবং দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠাবান এই মানুষটি আচরণের দিক থেকে ছিলেন বিনম্র। কিন্তু কর্তব্য কর্মে তাঁর ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা এবং দায়িত্ববোধের বিষয়ে ছিলেন খুবই সচেতন। মানুষ হিসেবে তাঁর চরিত্রের বৈপরীত্যপূর্ণ অবস্থান কখনো সাংঘর্ষিক হয়নি। আদালতে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সঙ্গে গ্রহণ করতেন এবং যুক্তিতর্ক ও আইনানুগ বিষয় উপস্থাপনে ন্যূনতম ছাড় দিতেন না; এমনকি সরকারদলীয় প্রভাবশালী কোনো আইনজীবী প্রতিপক্ষে থাকলেও মাহবুবে আলম নিজের অবস্থান থেকে কোনোভাবেই সরে আসতেন না। মামলার যুক্তিতর্ক শেষ হলে বা আদালতকক্ষ থেকে বের হওয়ার পরে বন্ধুবাৎসল্য নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে খোশগল্প ও হাসি-তামাশায় মেতে উঠে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতেন যে কয়েক মুহূর্ত আগে আদালতকক্ষে বিতর্কের কঠিন ঝড় উঠেছিল, তা ভাবাই যেত না। স্বভাবসুলভভাবে হাসি-আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে ভরপুর ছিলেন এই মানুষটি। কোনো আইনজীবী বিয়ে করেননি, তাঁকে ব্যাচেলর বলে কিছুটা আনন্দময় তির্যক বাক্য ছুড়ে দেওয়া, কে বিশাল ধনীর আইনজীবী, কে প্রভাবশালী ব্যক্তির আইনজীবী, তাঁদের সেভাবেই কিছুটা তির্যক অথচ হালকা ভাষায় সম্বোধন করে ভিন্নরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করতেন। তিনি কিছু মৌলিক বিষয় নিয়ে রাখঢাক ছাড়াই কথা বলতেন। বিচারপতির সন্তানদের আইন পেশায় থাকা না থাকা নিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর মতামত তুলে ধরতেন। আদালত প্রাঙ্গণে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে কর্মচারী-কর্মকর্তা, এমনকি কিছু বিচারকের বিষয়েও তাঁর অভিমত তুলে ধরতে কুণ্ঠিত হতেন না। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে কর্মরত কিছু কর্মকর্তার যোগ্যতা, সততা ও নিষ্ঠার বিষয়ে তিনি যেভাবে খোলামেলা কথা বলতেন, তা স্মরণে রাখার মতো। আদর্শের বিষয়ে তিনি পরিপূর্ণভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরতেন। কাজ এবং কাজের অবসরে পুরনো দিনের গান ও রবীন্দ্রসংগীত ছিল তাঁর সঙ্গী। বিভিন্ন বক্তৃতার মাঝে মনীষীদের বিভিন্ন বাণী উদ্ধৃত করতেন।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তাঁর ছিল অবিচল আস্থা। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক, সভাপতি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আইনজীবীদের ন্যায়সংগত আন্দোলন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবিতে সব আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। জুনিয়র আইনজীবী হিসেবে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন দেশের প্রথিতযশা সিনিয়র আইনজীবীদের কাছ থেকে। নম্রতা, ভদ্রতা, শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ এবং অপরকে শ্রদ্ধা ও স্নেহ করার অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তিনি। রাজনৈতিকভাবে কঠোর ভিন্নমতাবলম্বী আইনজীবীদের সঙ্গেও তাঁর সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। অনেক প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করেছেন ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে। নানারূপ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি, এমনকি জীবননাশের হুমকি, আদালত অঙ্গনে প্রচণ্ড প্রতিকূল পরিবেশেও অর্পিত দায়িত্ব পালনে কুণ্ঠিত হননি। গতানুগতিকতাকে পরিহার করে বিচারব্যবস্থায় আইনের ব্যাখ্যা, দেশ ও বিদেশের ঐতিহাসিক রায়কে নজির হিসেবে উপস্থাপন করতেন। ঘটনাগত যুক্তিতর্কের পাশাপাশি আইনগত বিষয় সমভাবে তুলে ধরে রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এ জন্য তাঁকে কখনো কখনো খাওয়া-ঘুম ভুলেও যেতে হয়েছে। কাটাতে হয়েছে গভীর রাত পর্যন্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের লাইব্রেরিতে। বার ও বেঞ্চের সমন্বয়ের জন্য অসাধারণ ভূমিকা ছিল তাঁর।
সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত মামলা, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মামলা, দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলা পরিচালনায় তাঁর যুক্তিতর্ক ও আইনগত দৃষ্টান্ত ওই সব মামলার রায় প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর অনেক আর্গুমেন্ট রায়ের অংশে পরিণত হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়ে সব সময় তিনি সোচ্চার ছিলেন। আইনজীবী ও আইনজীবী পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে তাঁকে দেখতে যাওয়া, সম্ভাব্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোনো বিচারককেই অসম্মানজনকভাবে সম্বোধন না করতে এবং বিচারব্যবস্থাকে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না করতে সব সময়ই তিনি আইনজীবীদের পরামর্শ দিতেন। ব্যক্তি মাহবুবে আলম ধীরে ধীরে আইন অঙ্গনে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। হাসপাতালের শয্যা থেকে তিনি কয়েক দিনই ফোনে কথা বলেছিলেন, তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল তিনি ফিরে আসবেন। ষোড়শ সংশোধনী মামলার রিভিউ শুনানি করবেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবেন বলে জানিয়েছিলেন, সে কথা আর শোনা হলো না। বিচার বিভাগকে তিনি অনেক দিয়েছেন। ব্যক্তি মাহবুবে আলম চলে গেলেন বটে; কিন্তু কর্তব্য, দায়িত্ব, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও বিচার বিভাগে তাঁর যে অসামান্য অবদান, তার মধ্যেই তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। মাহবুবে আলম আপনার প্রতি অতল শ্রদ্ধা। পরপারে অনেক ভালো থাকবেন।

শ ম রেজাউল করিম


লেখক : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী, সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান

Sharing is caring!



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *



More News Of This Category


বিজ্ঞাপন


প্রতিষ্ঠাতা : মোঃ মোস্তফা কামাল
প্রধান সম্পাদক : মোঃ ওমর ফারুক জালাল
সম্পাদক : মোঃ আমিনুল ইসলাম(আমিন মোস্তফা)
নির্বাহী সম্পাদক : এ আর হানিফ
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : শেখ মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ
কার্যালয় :-
৫৩ মর্ডান ম্যানশন (১২ তলা)
মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
ইমেইল : ajsaradin24@gmail.com
টেলিফোন : +8802-57160934
মোবাইল: 01725-484563,01942-741920
টপ